মনুসংহিতা
সপ্তম অধ্যায়
(রাজধর্ম )
রাজধর্মান্ প্রবক্ষ্যামি যথাবৃত্তো ভবেন্নৃপঃ।
সম্ভবশ্চ যথা তস্য সিদ্ধিশ্চ পরমা যথা।। (1)
বঙ্গানুবাদ- আমি তথা গ্রন্থকার এখন রাজধর্ম বর্ণনা করব- রাজা যেভাবে আচরণ করবেন, তাঁর উৎপত্তি যেভাবে হয়েছে এবং রাজকার্যে তাঁর উৎপত্তি সিদ্ধি যেভাবে হয় তাও বর্ণনা করব।
ব্রাহ্মং প্রাপ্তেন সংস্কারং ক্ষত্রিয়েণ যথাবিধি।
সর্বস্যাস্য যথান্যায়ং কর্তব্যং পরিরক্ষণম্।।(2)
বঙ্গানুবাদ- যথাবিধি উপনয়নরূপ বৈদিক সংস্কার প্রাপ্ত হয়ে রাজা ধর্মশাস্ত্রোক্ত নিয়ম অনুসারে সমস্ত প্রজাকে পরিপালন করবেন।
অরাজকে হি লোকে হ স্মিন্ সর্বতো বিদ্রুতে ভয়াৎ।
রক্ষার্থমস্য সর্বস্য রাজানমসৃজৎ প্রভুঃ।।(3)
বঙ্গানুবাদ-রাজশুন্য এই জগতে চারদিকে সকলে উৎপীড়িত হলে, সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে রক্ষার জন্য পরমেশ্বর রাজাকে সৃষ্টি করেছিলেন।
ইন্দ্রানিলযমার্কার্ণামগ্নেশ্চ বরুণস্য চ।
চন্দ্রবিত্তেশয়োশ্চৈব মাত্রা নির্হৃত্য শাশ্বতী।।(4)
বঙ্গানুবাদ- ইন্দ্র, বায়ু, যম, সূর্য, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র, এবংকুবেরের সারাংশসমূহ সংগ্রহ করে পরমেশ্বর রাজাকে সৃষ্টি করেছিলেন।
যস্মাদেষাং সুরেন্দ্রাণাং মাত্রাভ্যো নির্মিতো নৃপঃ।
তস্মাদভিভবত্যেষ সর্বভূতানিতেজসা।। (5)
বঙ্গানুবাদ-যেহেতু এই শ্রেষ্ঠ দেবগণের অংশ থেকে রাজার সৃষ্টি হয়েছিল, সেজন্য তিনি সমস্ত জীবকে তেজে অভিভূত করেন।
তপত্যাদিত্যবচ্চৈষ চক্ষুংষি চ মনাংসি চ।
ন চৈনং ভুবি শক্নোক্তি কশ্চিদপ্যভিবীক্ষিতুম্।। (6)
বঙ্গানুবাদ- রাজা সূর্যের ন্যায় চোখ ও মন পীড়িত করেন। পৃথিবীতে কেউ রাজার মুখোমুখি অবলোকন করতে পারেন না।।
সোহ গ্নির্ভবতি বায়ুশ্চ সোহ র্কঃ সোমঃ স ধর্মরাট্।
স কুবেরঃ স বরুণঃ স মহেন্দ্রঃ প্রভাবিত।। (7)
বঙ্গানুবাদ- রাজা অগ্নি, বায়ু, সূর্য, চন্দ্র, যম, কুবের, বরুণ ও ইন্দ্রের ন্যায় প্রতাপি হন।। 7
বালো হপি নাবমন্তব্যো মনুষ্য ইতি ভূমিপঃ।
মহতী দেবতা হ্যেষা নবরূপেণ তিষ্ঠতি।। (8)
বঙ্গানুবাদ- রাজা বালক হলেও তাঁকে মানুষ ভেবে অবহেলা করা উচিৎ নয়। কারণ, রাজা এক দেবতা যিনি মানুষের বেশে পৃথিবীতে অবস্থান করেন।
একমেব দহত্যগ্নির্নরং দুরুপসর্পিণম্।
কুলং দহতি রাজাগ্নিঃ সপ্তশুদ্রব্যসঞ্চয়ম্।। (9)
বঙ্গানুবাদ- অগ্নির নিকটে যে যায় ,কেবলমাত্র তাকেই অগ্নি দগ্ধ করে। রাজারূপ অগ্নি অন্যায়চারির বংশ, পশু ও সম্পত্তিসহ দগ্ধ করে।।
কার্যং সোহ বেক্ষ্য শক্তিঞ্চ দেশকালৌ চ তত্ত্বতঃ।
কুরুতে ধর্মসিদ্ধ্যর্থং বিশ্বরূপং পুনঃ পুনঃ।। (10)
বঙ্গানুবাদ-সেই রাজা প্রয়োজন, শক্তি, দেশ ও কাল ভালোভাবে বিচার করে কার্যসিদ্ধির জন্য বারংবার বিশ্বরূপ ধারণ করেন।। (10)
যস্য প্রসাদে পদ্মা শ্রীর্বিজয়শ্চ পরাক্রমে।
মৃত্যুশ্চ বসতি ক্রোধে সর্বতেজোময়ো হি সঃ।।(11)
বঙ্গানুবাদ-যাঁর অনগ্রহে বিপুল সম্পদলাভ হয়, যাঁর বীরত্বে জয়লাভ হয়, যাঁর ক্রোধে মৃত্যু বাস করে, তিনি প্রকৃত ই সর্বতেজোময়ো।।
তং যস্তু দ্বেষ্টি সম্মোহাৎ স বিনশ্যত্যসংশয়ম।
তস্য হ্যাশু বিনাশায় রাজা প্রকুরুতে মনঃ।। (12)
বঙ্গানুবাদ- সেই রাজাকে মোহবশতঃ যে বিদ্বেষ করে, সে নিঃসন্দেহে বিনষ্ট হয়, তাঁর ধ্বংস বা বিনাশের জন্য রাজা মনোযোগ দেন।
তস্মাদ্ধর্মং যমিষ্টেষু স ব্যবস্যেন্নরাধিপঃ।
অনিষ্টঞ্চ্যাপ্যনিষ্টেষু তং ধর্মং ন বিচালয়েৎ।।(13)
বঙ্গানুবাদ- অত এব রাজা অভিপ্রেত বিষয়ে যা করণীয় বলে স্থির করবেন এবং অনভিপ্রেত বিষয়ে যা অকরণীয় বলে ঠিক করবেন, সেই বিধান কেউ লঙ্ঘন করবেন না।।
তস্য অর্থে সর্বভূতানাং গোপ্তারম্ ধর্মম্ আত্মজা।
ব্রহ্মতেজোময়ম দণ্ডম্ অসৃজৎ পূর্বম্ ঈশ্বর।। (14)
বঙ্গানুবাদ-রাজার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য রাজার সৃষ্টির পূর্বে সমস্ত জীবের রক্ষক, ধর্মস্বরূপ পুত্র, ব্রহ্মতেজোময় দণ্ড ঈশ্বর সৃষ্টি করেছিলেন।
তস্য সর্বাণি ভূতানি স্থাবরাণি চরাণি চ।
ভয়াৎ ভোগায় কল্পতে স্বধর্মাৎ ন চলন্তি চ।। (15)
বঙ্গানুবাদ- অর্থাৎ, সেই দণ্ডের ভয়ে স্থাবরজঙ্গম সমস্ত প্রাণী ভোগ করতে সমর্থ হয় এবং কেউই স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হয় না।
তং দেশকালৌ শক্তিঞ্চ বিদ্যাঞ্চাবেক্ষ্য তত্ত্বতঃ।
যথার্হতঃ সম্প্রণয়েন্নরেষ্বন্যায়বর্তিষু।। (16)
বঙ্গানুবাদ- দেশ, কাল এবং অপরাধীর শক্তি, বিদ্যা বিবেচনা করে অপরাধীর যথাযোগ্য দণ্ডদান করবেন।
স রাজা পুরুষো দণ্ডঃ স নেতা শাসিতা চ সঃ।
চতর্ণামাশ্রমাণাঞ্চ ধর্মস্য প্রতিভূঃ স্মৃতঃ।। (17)
বঙ্গানুবাদ- সেই দণ্ডই রাজা, সেই পুরুষ, তিনিই নেতা, তিনিই শাসক এবং সেই দণ্ড ই আশ্রমচতুষ্টয়বিহিত ধর্মের জামিনদার (প্রতিভূ)।
দণ্ডঃ শাস্তি প্রজাঃ সর্বা দণ্ড এবাভিরক্ষতি।
দণ্ডঃ সুপ্তেষু জাগর্তি দণ্ডং ধর্মং বিদুর্বুধাঃ।। (18)
বঙ্গানুবাদ-দণ্ড সমস্ত প্রজাদের শাসন করে, দণ্ড ই সমস্ত প্রজাদের রক্ষা করে। অন্য সমস্ত রক্ষকেরা ঘুমিয়ে থাকলেও দণ্ড ই জাগরিত থাকে। তাই পণ্তডিগণ দণ্ডকেই ধর্ম বলে মনে করেন।
সমীক্ষ্য স ধৃতঃ সম্যক্ সর্বা রঞ্জয়তি প্রজাঃ।
অসমীক্ষ্য প্রণীতস্ত্তু বিনাশয়তি সর্বতঃ।। (19)
বঙ্গানুবাদ- বিবেচনাপূর্বক দণ্ড প্রয়োগ সমস্ত প্রজার মনোরঞ্জন করে। কিন্তু, অবিবেচনাপূর্বক দণ্ড প্রয়োগ সমস্ত দ্রব্যসামগ্রী বিনষ্ট করে দেয়।
যদি ন প্রণয়েদ্রাজা দণ্ডং দণ্ড্যেষ্বতন্দ্রিতঃ।
শূলে মৎস্যানিবাপক্ষ্যন্ দুর্বলান্ বলবত্তরাঃ।। (20)
বঙ্গানুবাদ- যদি রাজা নিরলসভাবে দণ্ডনীয়ের প্রতি দণ্ড প্রয়োগ না করেন, তাহলে অপেক্ষাকৃত বলবান ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তিদের মাছের মত হিংসা করত।।
অদ্যাৎ কাকঃ পুরোডাশং শ্বাবলিহ্যাদ্ধবিস্তথা।
স্বাম্যঞ্চ ন স্যাৎ কস্মিংশ্চিৎ প্রবর্তেতাধরোত্তরম্।।(21)
বঙ্গানুবাদ- যদি রাজা দণ্ডবিধান না করতেন, তাহলে কাক যঞ্জের পিষ্টক খেয়ে ফেলত, কুকুর যঞ্জীয় হবি লেহন করত এবং কার ও কোনো বিষয়ে অধিকার থাকত না। সর্বত্র অধরোত্তর তথা ওলট পালট অবস্থা দেখা দিত।
সর্বো দণ্ডজিতো লোকো দুর্লভো হি শুচির্নরঃ।
দণ্ডস্য হি ভয়াৎ সর্বম্ জগৎ ভোগায় কল্পতে।।(22)
বঙ্গানুবাদ-দণ্ডের দ্বারাই সমস্ত লোক নিমন্ত্রিত হয়ে থাকে। কারণ, স্বভাবতঃ বিশুদ্ধ ব্যক্তি দুর্লভ। দণ্ডের ভয়েই জগতের সকল প্রাণী ভোগ করতে সমর্থ হয়।
দেবদানবগন্ধর্বা রক্ষাংসি পতগোরগাঃ।
তেহ পি ভোগায় কল্পতে দণ্ডেনৈব নিপীড়িতাঃ।। (23)
বঙ্গানুবাদ- দেবতা, দানব, গন্ধর্ব, রাক্ষস, পক্ষী ,সর্প প্রভৃতিরাও দণ্ডের দ্বারা নিমন্ত্রিত হয়ে ভোগের অনুকূল হয়।
দুষ্যেয়ুঃ সর্ববর্ণাশ্চ ভিদ্যেরন্ সরবসেতবঃ।
সর্বলোকপ্রকোপশ্চ ভবেদ্দণ্ডস্য বিভ্রমাৎ।।(24)
বঙ্গানুবাদ- দণ্ডের অপব্যবহারের ফলে ব্রাহ্মণ প্রভৃতি সমস্ত বর্ণের মধ্যে দোষ উৎপন্ন হয়।,সকল শাস্ত্রীয় নিয়ম লোপ পায় এবং জনসমাজের মধ্যে একে অপরের প্রতি ক্রোধ উৎপন্ন হয়।
যত্র শ্যামো লাহিতাক্ষো দণ্ডশ্চরতি পাপহা।
প্রজাস্তত্র ন মুহ্যন্তি নেতা চেৎ সাধু পশ্যতি।।(25)
বঙ্গানুবাদ-যেখানে কৃষ্ণবর্ণ, রক্তনয়ন, পাপনাশক দণ্ড বিচরণ করে, সেখানে প্রজারা বিচলিত হন না, যদি দণ্ডপ্রণেতা রাজা যথাযথ বিচার করতে পারেন।
তস্যাহুঃ সম্প্রণেতারং রাজানং সত্যবাদিনম্।
সমীক্ষ্যকারিণং প্রাঞ্জং ধর্মকামার্থকোবিদম্।।(26)
বঙ্গানুবাদ- সত্যবাদী, বিবেচক, বুদ্ধিমান, ধর্ম, কাম ও অর্থে অভিঞ্জ রাজাকে সেই দণ্ডের যথার্থ পণ্ডিতগণ বলে থাকেন।
তং রাজা প্রণয়ন্ সম্যক্ ত্রিবর্গেণাভিবর্ধতে।
কামাত্মা বিষমঃ ক্ষুদ্রো দণ্ডেনৈব নিহন্যতে।। (27)
বঙ্গানুবাদ- সুষ্ঠুভাবে দণ্ডপ্রয়োগকারী রাজা ধর্ম, অর্থ ও কাম- এই ত্রিবর্গের দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হন এবং বিষয়াভিলাষী, ক্রোধ ও ছলান্বেষী রাজা দণ্ডের দ্বারা ই বিনষ্ট হন।
দণ্ডো হি সুমহত্তেজো দর্ধরশ্চাকৃতাত্মভিঃ।
ধর্মাদ্ বিচলিতং হন্তি নৃপমেব সবান্ধবম্।। (28)
বঙ্গানুবাদ- যেহেতু মহাতেজস্বরূপ দণ্ড শাস্ত্রঞ্জানহীন ব্যক্তিগণ কর্তৃক ধারণের অযোগ্য, সেহেতু, কর্তব্যভ্রষ্ট সবান্ধবে বিনাশ করে।
ততো দুর্গঞ্চ রাষ্ট্রঞ্চ লোকঞ্চ সচরাচরম্।
অন্তরীক্ষগতাংশ্চৈব মুনীন্ দেবাংশ্চ পীড়য়েৎ।।(29)
বঙ্গানুবাদ- অবিবেচনা পূর্বক দণ্ড প্রয়োগ করলে দুর্গ, দেশ, স্থাবরজঙ্গমবিশিষ্ট জগৎ এবং অন্তরীক্ষলোক দেবতা ও মুনিদের পীড়িত করে।
সো হসহায়েন মূঢ়েন লুব্ধেনাকৃতবুদ্ধিনা।
ন শক্যো ন্যায়তো নেতুং সক্তেন বিষয়েষু চ।। (30)
বঙ্গানুবাদ- সেই দণ্ড সহায়হীন, মূর্খ, লোভী, শাস্ত্রঞ্জানহীন ও বিষয়াসক্ত ব্যক্তি কর্তৃক ন্যায়ানুসারে প্রযুক্ত হতে পারেন।
শুচিনা সত্যসন্ধেন যথাশাস্ত্রানুসারিণা।
প্রণেতুং শক্যতে দণ্ডঃ সুসহায়েন ধীমতা।। (31)
বঙ্গানুবাদ- শুচি,সত্যপ্রতিঞ্জ,শাস্ত্রসম্মতব্যবহারকারী,উত্তম সহায়যুক্ত ও বুদ্ধিমান রাজা কর্তৃক প্রযুক্ত হতে পারে না।
স্বরাষ্ট্রে ন্যায়বৃত্তঃ স্যাদ্ ভৃশদণ্ডশ্চ শত্রুষু।
সুহৃৎস্বজিহ্মঃ স্নিগ্ধেষু ব্রাহ্মণেষু ক্ষমান্বিতঃ।। (32)
বঙ্গানুবাদ- রাজা নিজের রাজ্যে ন্যায়াচরণ করবেন, শত্রুর প্রতি কঠোর দণ্ডবিধান করবেন, স্নেহভাজন বন্ধু জ্ঞাতির প্রতি সরল ও ব্রাহ্মণদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন।
এবংবৃত্তস্য নৃপতেঃ শিলোঞ্ছেনাপি জীবতঃ।
বিস্তীর্যতে যশো লোকে তৈলবিন্দুরিবাম্ভসি।।33
বঙ্গানুবাদ- এরকম আবরণকারী রাজা শিলোঞ্ছো দ্বারা জীবন ধারণ করলেও তাঁর যশ জলে তৈলবিন্দুর মতো বিস্তার লাভ করে।
অতস্তু বিপরীতস্য নৃপতেরজিতাত্মনঃ।
সংক্ষিপ্যতে যশো লোকে ঘৃতবিন্দুরিবাম্ভসি।। (34)
বঙ্গানুবাদ- কিন্তু এর পূর্বোক্ত বিপরীত আবরণকারী অসংযতচিত্ত রাজার খ্যাতি জলে পতিত ঘৃতবিন্দুর ন্যায় সংকুচিত হতে পারে।
স্বে স্বে ধর্মে নিবিষ্টানাম্ সর্বেষাম্ অনুপূর্বশঃ।
বর্ণানাম্ আশ্রমাণাম্ চ রাজা সৃষ্টঃ অভিরক্ষিতা।।(35)
বঙ্গানুবাদ- যথাক্রমে নিজ নিজ ধর্মে মনোযোগী সমস্ত বর্ণের ও সমস্ত আশ্রমের রক্ষকরূপে রাজা সৃষ্ট হয়েছেন।
"মনুসংহিতা"-র সপ্তম অধ্যায়ে মোট শ্লোক সংখ্যা 226টি।






















মন্তব্যসমূহ